১০ টাকার চালের ৫৪ হাজার টন আত্মসাৎ

0
18

হতদরিদ্রদের জন্য সরকারের বিশেষ খাদ্য সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে ওজনে ব্যাপক কারচুপির প্রমাণ পেয়েছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। তাদের অনুসন্ধান বলছে, তিন মাসে ৯০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও সুবিধাভোগীরা পেয়েছেন গড়ে ৭৯ কেজি।

অর্থাৎ একেকজনের কাছ থেকেই মেরে দেয়া হয়েছে ১১ কেজি করে। এই হিসাবে এই কর্মসূচিতে আত্মসাৎ হয়েছে ৫৪ হাজার টনেরও বেশি। পরিবেশকরাই এই চাল মেরে দিয়েছেন।

শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে চলতি অর্থবছর নিয়ে এক পর্যালোচনায় এ কথা জানান সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা গবেষণা করে দেখেছি হতদরিদ্র পরিবারগুলো তিন মাসে ৯০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও তারা পেয়েছে গড়ে ১১ কেজি কম। তারপর এ চাল কারা পাবে তা নিয়েও জটিলতা দেখা দিয়েছে কারণ আমদের দেশে হতদরিদ্রের সঠিক সংজ্ঞা নেই।’

উপকারভোগী ৪৯ লাখ পরিবার

হতদরিদ্র মানুষদের জন্য বিশেষ খাদ্য সহায়তা হিসেবে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রামের চিলমারীতে গত ৭ সেপ্টেম্বর ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন হয়। এই কর্মসূচি উব্দোধনের দিন জানানো হয়, প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে তিন মাস এই চাল দেয়া হবে।

চিলমারীতে চালু হওয়া এই কর্মসূচি এরপর সারাদেশে চালু হয়। সিপিডি জানায়, সরকার মোট ৫০ লাখ পরিবারকে সহায়তা দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই প্রকল্প চালু করে। তবে প্রথম ধাপে সহায়তা পেয়েছে ৪৯ লাখ ১০ হাজার পরিবার। এই কর্মসূচির আওতায় সরকার নয় হাজার ৮৭৮ জন পরিবেশকের মাধ্যমে মোট তিন লাখ ৮৮ হাজার ৬৯৫ টন চাল বণ্টন করে।

সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী একেকজনের কাছ থেকে ১১ কেজি করে চাল আত্মসাৎ করা হলে মোট ৫৪ হাজার ১০ টন চাল মেরে দেয়া হয়েছে।

অনিয়মের অভিযোগ শুরু থেকেই

কর্মসূচি চালুর পর পরই হতদরিদ্রদের বাদ দিয়ে সম্পদশালীদেরকে তালিকাভুক্ত করা, চাল বিতরণ দেখিয়ে আত্মসাৎ এমনকি ওজনে কম দেয়ার অভিযোগ উঠে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে অনিয়মের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেয়ার পরও অনিয়ম থামেনি।

সিপিডি বলছে, অনিয়মের অভিযোগে সরকার ৪.৫ শতাংশ উপকারভোগীর নাম বাদ দেয়ার পাশাপাশি ১.৩ শতাংশ পরিবেশকের লাইসেন্সও বাতিল করে।

এরই মধ্যে তিন মাসের কর্মসূচি শেষ হয়েছে। চলতি বছর এই কর্মসূচি চালুর আগেই গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে আগেই ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। সেই সঙ্গে হতদরিদ্রদের পাশাপাশি পোশাক শ্রমিকদের জন্যও একই কর্মসূচি চালুর পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। দেবপ্রিয় বলেন, ‘আমি মনে করি তারা এ চাল পাবার দাবিদার। তাহলে পোশাক শ্রমিক আন্দোলন কিছুটা স্থিমিত হবে।’

নরসিংদীর অভিজ্ঞতা

অনুষ্ঠানে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে নরসিংদীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায় প্রতি উপকারভোগী ৯০ কেজির বদলে চাল পেয়েছেন ৮২ কেজি করে। বাকি চাল আত্মসাৎ করেছেন পরিবেশকরা। এই পরিবেশন নির্বাচনে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। পরিবেশকরাই নির্ধারণ করেছেন কাদেরকে চাল দেয়া হবে।

এতে দেখা যায়, একজন পরিবেশকের অনেক বড় এলাকা দেয়ায় চাল সংগ্রহে তার খরচ বেশি হয়েছে। আবার চাল মাপার ক্ষেত্রে নির্ধরিত যন্ত্রের বদলে বালতির হিসাবে চাল দেয়ার জন্যই ওজনে কম পেয়েছেন উপকারভোগীরা।

আর চাল বিতরণের ক্ষেত্রে পরিবেশকদের যে টাকা দেয়া হয়েছে, সেটাকেও অপর্যাপ্ত বলছে সিপিডি। নরসিংদীতে একেকজন পরিবেশক পেয়েছেন ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা করে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ছয় পরামর্শ

গবেষণা সংস্থাটি বলছে, হতদরিদ্রদের জন্য এই বিশেষ খাদ্য সহায়তা চালু হলেও হতদরিদ্র কারা-এই সংজ্ঞাই নির্ধারণ করা হয়নি। এই সুযোগেই ঘটেছে ব্যাপক দুর্নীতি। সেই সঙ্গে কোন কোন এলাকায় এই কর্মসূচি চালু হওয়া দরকার-এ বিষয়েও তথ্যের ঘাটতি ছিল।

এই আলোকে আগামীকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা আনতে প্রথমেই হতদরিদ্রদের সংজ্ঞা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। এরপর দারিদ্র্যের মানচিত্র অনুযায়ী এলাকা নির্ধারণ করে সেসব এলাকায় এই কর্মসূচি চালু করতে বলেছে তারা।

পরিবেশক নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও যাচাইবাছাই করার পাশাপাশি তাদের ওপর নরজদারির তাগিদও দিয়েছে সংস্থাটি।

সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন, নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ফাহমিদা খাতুনও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্য নেই মন্ত্রণালয়ের

সিপিডির এই পর্যবেক্ষণের বিষয়ে জানতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব কায়কোবাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘সিপিডি কী বললো না বললো সে বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’

জনাব কায়কোবাদ এই বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংগ্রহ ও সরবরাহ) আতাউর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে এই সরকার কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি তা ধরেননি।

ঢাকাটাইমস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here